গল্পের নাম
তোমার অপেক্ষায়
প্রথম পরিচয়
শহরের কোলে ছোট্ট এক কলেজ, নাম—'নবদিগন্ত মহাবিদ্যালয়'। কলেজটা বড় নয়, কিন্তু তার চৌহদ্দিতে জীবন গড়ে ওঠে বহু তরুণ-তরুণীর। সেখানেই পড়ে নীলিমা—দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, ইংরেজি সাহিত্যে তার অদ্ভুত এক ভালোবাসা। শান্ত স্বভাব, চোখে চশমা, চুল গোঁজা, সবকিছুতেই একটা পরিপাটি ছোঁয়া।
আর রাফি—কলেজের বাইরের বইয়ের দোকানের ছেলে। বাবার সঙ্গে দোকান চালায়, সাহিত্যের পোকা। প্রতিদিন বিকেলে কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে বই নিয়ে। শুধু বই বিক্রির জন্য না, তার চোখ খোঁজে নীলিমাকে।
প্রথমবার যখন নীলিমাকে দেখেছিল, তখন তার হাতে ছিল রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা। চোখের কোণে একটা শান্ত ঝড় ছিল—যেটা অন্য কেউ হয়তো খেয়াল করত না, কিন্তু রাফি করেছিল।
তারপর থেকে প্রতিদিন, একটাই রুটিন—রাফি এসে দাঁড়ায় গেটের কাছে, একটা বই হাতে। কখনও চোখের বালি, কখনও প্রেম ও প্রকৃতি, আবার কখনও কাবুলিওয়ালা।
নীলিমা জানে, সে তাকে দেখছে। কিন্তু কিছু বলে না। মাঝে মাঝে চোখ পড়ে যায়, অল্প হেসে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।
একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নামে। সবাই ছুটে যায় ছায়ার খোঁজে। রাফি তখন হাতে একটা ছাতা নিয়ে দৌড়ে যায় কলেজ গেটের দিকে। নীলিমা দাঁড়িয়ে ভিজছে—ভিজে গেছে তার খাতা, জামা, চুল।
রাফি একটু থেমে বলে, "ছাতা… নিন।"
নীলিমা তাকিয়ে থাকে। অল্প হেসে বলে, "তুমি রোজ থাকো এখানে?"
রাফি হেসে বলে, "একজনকে দেখার অপেক্ষায় থাকি।"
সেই দিনের বৃষ্টি যেন দুইটি হৃদয়ের ভেতরে চিরদিনের ভিজে পথ রেখে যায়।
সম্পর্কের শুরু
সেই বৃষ্টিভেজা দিনটার পর যেন কিছু বদলে যায়। রাফি আর নীলিমার মাঝে একটা নিরব বন্ধন তৈরি হয়—যেটা শব্দে প্রকাশ পায় না, কিন্তু প্রতিদিন অনুভব করা যায়।
পরদিন নীলিমা কলেজে ঢোকার সময় রাফির দিকে একটু তাকিয়ে হেসে নেয়। রাফির মনে হয়, এই হাসি বুঝি তার বুকের ভেতর ঝড় তুলে দেয়।
রাফি প্রতিদিন নতুন এক বই নিয়ে দাঁড়ায়। একদিন এগিয়ে দিয়ে বলে, "এইটা পড়েছেন? বিভূতিভূষণের অপরাজিত।"
নীলিমা বইটা হাতে নিয়ে দেখে। পাতাগুলো পুরোনো, কিন্তু যত্নে রাখা। সে জিজ্ঞেস করে, "তুমি পড়ো নাকি বিক্রি করো?"
রাফি হেসে বলে, "পড়ে তবে বিক্রি করি। নিজের ভালো না লাগলে অন্যকে দিতে ইচ্ছে করে না।"
ওদের কথা বাড়তে থাকে—প্রথমে বই নিয়ে, তারপর সিনেমা, কবিতা, আর একদিন নিজেদের জীবন।
এক বিকেলে, কলেজ ছুটির পর রাফি বলে, "এক কাপ চা হবে? দোকানের পাশের মোড়ে দারুণ বানায়।"
নীলিমা একটু দ্বিধা করেও হ্যাঁ বলে। দুজন বসে চায়ের কাপ হাতে, শহরের হালকা বাতাসে চুল উড়ছে, রাফি চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
চা শেষ হলে, রাফি হাত বাড়িয়ে বলে, "তোমার খাতাটা ভিজেছিল সেদিন, পাতা গুছিয়ে দিয়েছি।"
নীলিমা খাতা নিতে নিতে হালকা ছুঁয়ে যায় রাফির আঙুল। সেই স্পর্শে একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়ে দুজনের মাঝে।
নীলিমা বলল, "এই শহরে হাজার মানুষ, কিন্তু কেউ কখনও আমাকে পড়া ছাড়া কিছু দেয়নি।"
রাফি বলল, "তোমাকে দেখার পর থেকে আমি আর শুধু বইয়ের চরিত্র পড়ি না—তোমাকেও পড়ি। প্রতিদিন।"
দূরত্ব ও কষ্ট
শীত আসছে ধীরে ধীরে। শহরের বাতাসে কুয়াশার চাদর। রাফি আর নীলিমার বন্ধন এখন অনেকটাই দৃঢ়—কথা হয় প্রতিদিন, দেখা হয় প্রায়ই।
একদিন বিকেলে, চায়ের টেবিলে বসে নীলিমা বলল, "আমার অ্যাপ্লাই করা স্কলারশিপটা হয়ে গেছে রাফি… আমি লন্ডনে যাচ্ছি মাস তিনেক পর।"
রাফি শুধু বলে, "তুমি খুশি তো?"
নীলিমা হালকা মাথা নাড়ে, হাসে, কিন্তু চোখে জল জমে।
“ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন—তাকে যেতে দেওয়া, না ধরে রাখা?”
বাকি দিনগুলোতে রাফি আগের মতো করে হাসে, গল্প করে, নীলিমার পছন্দের বই পড়ে শোনায়। কিন্তু তার চোখে জমে থাকে না বলা অনেক কথা।
সেই রাতে নীলিমা ফোনে জিজ্ঞেস করে, "তুমি বলো না রাফি, তুমি কষ্ট পাচ্ছো না?"
রাফি বলে, "তোমার স্বপ্নের পথে কষ্ট আমার আনন্দের মধ্যে পড়ে।"
বিদায়ের দিন, রাফি তার বাবার পুরোনো পাঞ্জাবি পরে আসে। হাতে একটা ছোট খাম—তার লেখা প্রথম চিঠি।
নীলিমা কাঁপা গলায় বলে, "আমি ফিরে আসব… কিন্তু তুমি থাকবে তো?"
রাফি হেসে বলে, "একটা মানুষকে প্রতিদিন দেখে তার জন্য অপেক্ষা করতে শিখেছি। এখন তো তার জন্য অপেক্ষা করাটা জীবন।"
ফিরে আসা
তিন বছর।
প্রতিদিন রাতে রাফি লিখে একেকটা চিঠি—নীলিমার নামে। কিন্তু কোনো চিঠি পোস্ট করে না। কাঠের ছোট একটা বাক্সে জমে জমে উঠেছে ১০৯৫টা চিঠি।
এপ্রিলের এক হালকা রোদেলা বিকেল। কলেজের গেটের সামনে হঠাৎ এক পুরোনো ছায়া ফিরে আসে। সাদা পাঞ্জাবি পরা, হাতে বই। রাফি।
ঠিক তখনই পেছন থেকে এক কণ্ঠস্বর— "এই চিঠিগুলো কি আমার জন্য?"
রাফি ধীরে ঘুরে তাকায়।
নীলিমা।
চুল আগের মতোই খোলা, চোখে সেই চশমা। কিন্তু চোখে আজ অন্যরকম একটা দীপ্তি।
নীলিমা এগিয়ে এসে বলে, "এগুলো পড়ব, কিন্তু আজ একটা নতুন চিঠি চাই। হাতে হাতে, মুখোমুখি।"
রাফি হেসে বলে, "চিঠি লিখিনি আজ, কারণ তুমি সামনে। শুধু একটা কথা বলব—তুমি এসেছো…"
নীলিমা জবাব দেয়, "তুমি তো ছিলে।"
সেই গেটের সামনে আবার দুজন দাঁড়ায়। পেছনে সূর্য ডুবে যায় ধীরে। কিন্তু তাদের জন্য তখন এক নতুন সূর্য উঠছে—প্রেমের, প্রতিজ্ঞার, আর নতুন এক জীবনের।
.png)
Comments
Post a Comment